Headlines
Loading...
                    

পুর্বসূত্র: ১৯৬৮ সালে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। একই বছর এপ্রিল মাসে আব্বার বদলি হয় দিনাজপুর  থেকে পাবনার উল্লাপাড়া থানায়। ওসি হিসেবে তিনি সেখানে যোগ দেন। দুমাস পর আবার তাঁর বদলি হয় বেড়া থানায়।

আমার ছোট তিন ভাইবোন তখন বেড়ার স্কুলে ভর্তি হয়। তারা নৌকায় করে স্কুলে যেত। আমি প্রায়ই ছুটিতে রাজশাহী থেকে পাবনায় যেতাম। বেড়া থানা ছিল একদম নদীর ধারে। থানার পাশেই ছিল আমাদের ওঠা-নামার বড় নৌকা- 'ওসির নৌকা

সন্ধ্যার পর প্রায়ই আমি গিয়ে নৌকায় বসতাম। মাঝি নৌকা বেয়ে অনেক দূর নিয়ে যেত। দুই পাড়ের গ্রামগুলোতে তখন বিদ্যুৎ ছিল না- তবু কোথাও কোথাও মিটিমিটি আলো জ্বলত। নদীর ওপর সেই নরম আলো, নিস্তব্ধ প্রকৃতি- সব আজও স্মৃতিতে অমলিন।

নগরবাড়ি ঘাটের পাশে থানার একটি বড় লঞ্চ নোঙর করে রাখা থাকত। বহুবার আমি সেখানে রাত কাটিয়েছি। বসে বসে দেখতাম- ঘাটে মানুষ উঠছে, নামছে; গাঙচিল হঠাৎ পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরে আবার উড়ে যাচ্ছে।   সে সব দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে পরিচয় হয় কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে, এঁরা পাবনার জিয়াউল ইসলাম হেলালী, শিবজিত নাগ, সৈয়দ সরোয়ার হোসেন রেণু, . সালমা জুবেরী রুনু, সুফিয়া খাতুন আরজু এবং ফেরদৌস খান চিনু। আরও অনেকের নাম ভুলে গেছি। এঁরা সবাই আমার সহপাঠী। বন্ধুত্ব আজও অটুট।

বেড়া থেকে ফেরার পথে প্রায়ই যাত্রাবিরতি করতাম পাবনা শহরের শিবজিতের আবদুল হামিদ রোডের বাড়িতে। মাসী আমাকে খুব আদর করতেন। তখন শিবানীও জীবিত। অসাধারণ গান করত।

পাবনায় আরেকটি প্রিয় জায়গা ছিল শিবজিতের বাড়ির উল্টো দিকে 'লক্ষ্মী ভান্ডার আড্ডা দিতে দিতে মিষ্টি  খেতাম। ধীরে ধীরে ওই এলাকার বহু পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয়। অনেকেই আব্বাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

রাজশাহীতে আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই থাকতেন সুনীল গাঙ্গুলীর ছোট বোন বীনা পিসি। তাঁর বিয়ে হয়েছিল পাবনার পরিচিত ব্যোমকেশ লাহিড়ির পরিবারের সঙ্গে। এই সূত্রে পাবনার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এভাবে বহু মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক আজও অটুট। এত বছর পরেও যোগাযোগ রয়ে গেছে, যা সত্যিই এক বড় আশীর্বাদ।

রাজশাহীতে তখন আমি একা থাকতাম। আব্বা অনেক চেষ্টা করে অবশেষে রাজশাহীতেই বদলি নিলেন-ডিআইজি অফিসে। আমার ভাইবোনদের পড়াশুনার সুবিধার জন্যই তাঁর এই চেষ্টা।

তারপর এল উত্তাল সময়- ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন। সেনাবাহিনীর হাতে প্রফেসর জোহার নির্মম হত্যার টনায় সারা রাজশাহীতে অস্থিরতা। তারপর ১৯৭১ সালের মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ। আমাদের মনে তখন স্বাধীনতার আগুন জ্বলে উঠেছে। ঠিক এই সময়েই বড় দুঃসংবাদ এলো। আব্বার আবার বদলি। ১৫ মার্চ তাঁকে দিনাজপুরে পাঠানো হলো। নানা কষ্টের মধ্যেও তিনি দায়িত্ব নিলেন।              

   

মার্চ ১৯৭১ : আমরা তখন তরুণ যুবক। আম্মাকে নিয়ে আমরা চার ভাইবোন রাজশাহীর কাজিহাটার বাড়িতে থাকি। আব্বা দিনাজপুরে পোস্টেড। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই চারিদিকে আন্দোলনের জোয়ার। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থার্ড ইয়ার অনার্সে পড়ি; মনজু কলেজে; আনজু আর রনজু স্কুলে। বিশ্ববিদ্যালযয়ের ক্লাস বন্ধ।

বঙ্গবন্ধুর মার্চের ভাষণের পরে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। আমরা মিছিলে অংশ নিচ্ছি, ডামি বন্দুক নিয়ে  ট্রেনিং করছি।

অবশেষে এলো ২৫ মার্চের কালরাত্রি। নিদ্রাহীন রাত শেষে জানতে পারলাম চারদিকে মৃত্যু আর ধ্বংস। কিছুদিনের জন্য শহর স্বাধীনতা যোদ্ধাদের হাতে আসে। খবর পেলাম- আর্মি নগরবাড়ি ঘাট পেরিয়ে এগিয়ে আসছে। রাজশাহীতে থাকা আর নিরাপদ নয় ভেবে ঠিক করলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাব। সেখানে আছেন ছোট মামা, আছেন নানা। আমরা সবাই নবাবগঞ্জে নানার বাড়িতে উঠলাম। আমার ছোট মামা তখন ওখানকার সদরের এমপি। কয়েকদিন সেখানেই আশ্রয়।

একদিন দেখি- অসংখ্য কষ্ট সহ্য করে আব্বা দিনাজপুর থেকে চলে এলেন। আমাদের সুখ আর আনন্দের সীমা রইল না। হঠাৎ একদিন ছোট মামা তাঁর দলবল নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিলেন। আমরা নানার গ্রামের বাড়িতে চলে এলাম। কারণ খবর আসছিল যে চাপাইনবাবগঞ্জ শহরে আর্মি ঢুকে পড়েছে।

মে মাসের মাঝামাঝি- এক সন্ধ্যায় আব্বা আমাকে ডেকে পাঠালেন। মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। এর আগেও আমরা তিনজন- আব্বা, মনজু আমি সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। 

 ঠিক ছিল- আম্মা ছোট দুই ভাইবোনকে নিয়ে নানার কাছে থাকবেন। আব্বার ধারণা ছিল একবার কলকাতায় পৌঁছাতে পারলে রাজশাহী কলেজের তাঁর রুমমেট সহপাঠী ডা. জয়নাল আবেদীন (তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী) ব্যবস্থা করে দেবেন। আব্বা মুজিবনগর সরকারে যোগ দেবেন, আর আমরা দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারব। কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না। পায়ে হেঁটে অনেক কষ্ট করে বর্ডারের খুব কাছাকাছি গিয়েও ফিরতে হলো। নদী পার হওয়া গেল না। আর্মিরা  নৌকাগুলো ডুবিয়ে দিয়েছিল। বাধ্য হয়ে ফিরে আসা ছাড়া উপায় ছিল না।

কয়েকদিন পর পিস কমিটির লোকজন জুম্মার নামাজ শেষে নানার বাড়িতে এসে আব্বাকে বললো, 'আপনি আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন- আমরা সম্মান করি। কিন্তু পাকিস্তান সরকার সবাইকে কাজে যোগ দিতে বলেছে। আপনি যোগ না দিলে আমাদের বিপদ হবে। বাধ্য করবেন না- আপনাকে তুলে দিতে হবে। আব্বা বুঝলেন- আর উপায় নেই। তাঁকে কাজে যোগ দিতেই হবে। অবস্থায় নিজের কাছে থাকা রিভলভার আর ৫৪ রাউন্ড গুলি আমাকে দিয়ে বললেন, 'তুমি আমার বড় ছেলে, কী করবে- তুমি জানো। তুমি এগুলো জমা দিতে  যেও না। আমার এক সহকর্মী ইন্সপেক্টর জমা দিতে গিয়ে আর্মির হাতে মারা গেছে। ওরা আমাকেও মেরে  ফেলবে।

পরদিন ভোরে দোয়া-দরুদ পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে অন্যদের সঙ্গে সাইকেলে চাপাইনবাবগঞ্জে রওনা হলেন। দুই-তিন দিন কাজ করার পরে তাঁকে বলা হলো- রাজশাহীতে যোগ দিতে হবে।

রাজশাহীতে তিনি একাই রওনা দিলেন ঘোড়ার গাড়ির টমটমে চড়ে। অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত- কারণ এর সঙ্গে জড়িত ছিল তাঁর জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি। আমাদের সবার কাছ থেকে খুব কষ্টে বিদায় নিয়ে তিনি রওনা দিলেন অনিশ্চিতের পথে।

আমরা তাঁর খোঁজে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছি। ফোন নেই, চিঠিও আসা-যাওয়া বন্ধ। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে- আর আমরা আব্বার কোনো খবর পাচ্ছি না।

ঠিক এমন সময় একদিন সন্ধ্যার আগে আমার খালু রাজশাহী থেকে নানার বাড়িতে এসে হাজির হলেন। মুখ গম্ভীর। নানার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ চলল। আমাদের সেখানে যেতে দেয়া হচ্ছিল না। বুঝলাম- ভয়ংকর কোনো খবর। অবশেষে আম্মার জোরাজুরিতে আমি ঢুকতেই খালু বললেন, 'তোমরা এখনও বুঝতে পারোনি? তোমাদের আব্বাকে আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে। আর কোনো খবর নেই।

আমাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। জীবনে প্রথমবার সেই রাতটি কাটলো সম্পূর্ণ জেগে, কান্নায়, আতঙ্কে, অসহায়তায়। আমরা চার ভাইবোন আম্মার গায়ে লুটিয়ে কাঁদছি। ভাবছি- আব্বা যদি ফিরে না আসেন তবে আমাদের দিন কীভাবে চলবে। সারারাত কেঁদেছি।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি :  বিনিদ্র রজনী কাটলো। পরদিন সকাল বেলা আমার মনে আছে- আম্মা স্থিরভাবে বললেন, 'আব্বা, আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে রাজশাহী চলে যাচ্ছি। আমার অনেক কাজ। আমাকে খুঁজে বের করতে হবে মুক্তার আব্বাকে। আম্মা কিভাবে এত শক্ত হলেন? কোথা থেকে এত শক্তি পেলেন এভাবে- সেকথা এখনো ভাবি। আমার মনে আছে, বালিয়াডাঙ্গা থেকে চাপাইনবাবগঞ্জ গরুর গাড়িতে রওয়ানা হলাম। সারা রাস্তায়  দোয়া-দরুদ পড়েছি। আমি লুঙ্গি পরা, মাথায় টুপি, হাতে ওজিফার একটা বই। আমার সঙ্গে মনজু। আম্মার সঙ্গে গাড়ির মধ্যে আনজু আর রনজু। ইপিআর-এর কল্যাণপুর ক্যাম্প পার হবার সময় ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ওরা আমাদের কিছু বলল না। আমরা ট্রেনে উঠে গেলাম। রাজশাহীর কাদিরগঞ্জে খালার বাসায় আমাদের আশ্রয়। খালু অদ্ভুত মানুষ। তাঁর এতগুলি ছেলেমেয়ে। নিজের খাবার জোটাতে ওনার প্রাণান্ত। হাসিমুখে আমাদেরকে গ্রহণ করলেন। আম্মাকে বললেন, 'আমাদের যদি খাওয়া হয়, তোর ছেলেমেয়ের খাবার অভাব হবে না। আমাদের খালু কাজী আবদুল মুত্তালিবের মত মানুষ পৃথিবীতে খুব বেশি আমি দেখিনি।  ওনাকে দেখেছি খুব ভোরবেলা উঠে নামাজ পড়ে পাঞ্জে সুরার একটা বই হাতে নিয়ে কোরআন তেলওয়াত করছেন। 

খালু আজ আর আমাদের মাঝে নাই, কিন্তু উনার খালামার এই অবদান আমাদের পরিবার সারাজীবন মনে রাখবো। আমরা কি করব- আমার হাতে কোন টাকা পয়সা নাই। ব্যাংকে টাকা পয়সা ছিল কিনা সেটা আমাদের জানা নাই। এই অবস্থায় কে আমাদেরকে সাহায্য করবে- এই ভেবে আকুল।                                                                                              

অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম  রেডিওতে গিয়ে ওখানকার রিজিওনাল ডাইরেক্টর সাইফুল্লাহ সাহেবের সংগে দেখা করি। আল্লাহর নাম করে আমি একদিন রাজশাহী রেডিওতে গেলাম। ওখানে আমার অনেকেই পরিচিত, কারণ আমি রেডিওর অনেকদিনের নাট্যশিল্পী। ভয় ছিল উনি আমার মত একজন নগণ্য নাট্যশিল্পীর সংগে দেখা করবেন কিনা। উনি আমাকে চিনতেন। আব্বাকেও ভালোভাবে চিনতেন। উনার মেয়ে আমার প্রয়াত বোনের সঙ্গে পড়তো। উনাকে স্লিপ পাঠালাম এবং দেখা করবার অনুমতি পেলাম। আমি উনাকে সব খুলে বললাম। আব্বার নিখোঁজ হবার কথা, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা এবং পরিশেষে আমার নিজের নিরাপত্তার কথা- উনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। আমাকে উনি বললেন, 'আমি বলে দিচ্ছি যেন অনুষ্ঠান ঘোষক হিসেবে তোমার অডিশন নেয়া হয়।  অনুষ্ঠান ঘোষণায় তোমাকে আমি সারা মাসের প্রোগ্রাম দিব, যাতে তুমি একটা ভালো অ্যামাউন্ট পাও। সেটা দিয়ে  তোমাদের সংসার কোনভাবে চালাতে পারবে।

আমি রেডিওতে কাজ শুরু করলাম। উনি আমাদের জন্য বিরাট ঝুঁকি নিলেন। উনি একজনকে সুযোগ করে দিলেন, যার বাবা মিলিটারির হাতে বন্দী। উনি তো পাকিস্তানপন্থী। কেন  এই ঝুঁকি নিলেন? তার উত্তর আমি  মেলাতে পারিনি। হয়তো আল্লাহই এই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

অনুষ্ঠান ঘোষণার কাজে রেডিওতে লম্বা সময় থাকতে হয়। একটা পরিচয়পত্র পেলাম (মিলিটারিরা যেটাকে বলতো ডান্ডি কার্ড) যেটা আমার জন্য ওই সময়ে রক্ষাকবচ ছিল। রেডিওতে কাজ করার সুবাদে মুক্তিযুদ্ধের অনেক খবর  পেতাম। প্রচুর মিলিটারিদের আনাগোনা ছিল। যুদ্ধে মার খেলে বিমর্ষ থাকতো। সেই সময়ে টেলিভিশন রেডিও খুব গুরুত্ব বহন করত- কারণ ছিল সরকারের প্রচারযন্ত্র। দেখেছি রিজিওনাল ডাইরেক্টরকে আর্মি অফিসাররা পর্যন্ত খুব সমীহ করে চলত। ফুল কর্নেলের নীচে কোন অফিসারের সঙ্গে উনি দেখা করতেন না।

বেতার ভবনে যুদ্ধের সময়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গেলে বিরাট এক পরিচ্ছদ  হয়ে যাবে। যাই হোক, প্রথম মাসের চেক পেলাম। আমার মনে আছে ২২০ টাকা। যেটা পাকিস্তান আমলে খুব কম টাকা নয়। আম্মার হাতে তুলে দিলাম পুরো টাকা। আম্মা আমার প্রথম রোজগারের টাকা পেয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন।

কিছুদিন যাবার পরে খালু-খালামাকে বুঝিয়ে আমাদের কাজিহাটার বাসায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ আর কতদিন উনাদেরকে কস্ট দিব? যে মহানুভবতা উনারা দেখিয়েছেন তার তুলনা নাই। উনারা পাশে না দাঁড়ালে আমরা তো ভেসে যেতাম।

শুরু হল আমাদের চার ভাইবোন আম্মার একলা জীবন সংগ্রাম। আমি বড়, কতই বা আমার বয়স ২১ বছর, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনাল ইয়ার অনার্সে পড়ি, বাকী ভাইবোনেরা চার থেকে সাত বছরের ছোট। রেডিওর অনুষ্ঠান, আর বাকি সময়টা বেশিরভাগ সময় আমার মনে আছে- আমি বিকেলের দিকে শাহ্‌‌ মখদুম সাহেবের দরগায় চলে  যেতাম। ওখানে কয়েক ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আল্লাহ্ কাছে কান্নাকাটি করতাম। আমদের অসহায় অবস্থা। পারলে তৃণ পেলেই আকড়ে ধরি। পীর, ফকির, ওঝা- যে যেটা বলেছে, সেখানেই গেছি আব্বার খবর পাবার জন্য। আমাকে অনেক সংগ দিত খালাতো ভাই, আমার বয়সী মারজুক। বাসায় থাকলে দেখি আম্মা কাঁদছেন, ভাই  বোনেরা বিমর্ষ হয়ে বসে আছে। চিন্তা করি, আব্বা না ফিরলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি হবে? কি ভাবে এই বন্ধুর পথ পাড়ি দিব? আমার কিন্তু কেন যেন মনে হত- আব্বা আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।

      আহমেদ পরিবার (সম্ভবত ১৯৯৭ সাল)

আমার দাদা গ্রাম থেকে এলেন। বৃদ্ধ মানুষ। আমার মাকে নিয়ে বোরখা পরিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাওয়া শুরু করলেন। পুলিশ অফিসে, যেখানে আব্বা চাকরি করতেন- সেখানে দেখা করলেন। খুব একটা ভালো আশ্বাস পেলেন না। বরঞ্চ ভারপ্রাপ্ত এসপি বললেন যে, আপনি ফিরে যান এবং মৃত মানুষের জন্য যেটা করতে হয় সেটাই করেন। এখানে এসে লাভ নাই। আমার মা খুব বেশি শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু উনার মধ্যে যে জেদ আমি দেখেছি তাতে বিস্মিত হয়েছি। উনি এর শেষ দেখতে চাচ্ছিলেন।

একদিন আমার দাদাকে নিয়ে মা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবিরী হাউসে গেলেন। এখানে আর্মি ক্যাম্প ছিল এবং ঊর্ধ্বতন অফিসাররা বসতেন। আম্মার  কাছে শুনেছিলাম, ওনাকে এবং দাদাকে একটা ট্রেঞ্চের মধ্যে বসিয়ে রাখা হয়েছিল অনেকক্ষণ। পরে উনাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একজন আর্মি অফিসারের সঙ্গে দেখা করাতে।  অফিসার বলেছিলেন, আমাকে ডিটেলস দিয়ে যাও। যদি সম্ভব হয় আমি দেখবো বেঁচে আছে না মারা গেছে- এরকম আমাদের কাছে কোন তথ্য আছে কিনা। আমাদের কাছে এসেছিলো কিনা তোমার স্বামী। পরে খোঁজ নিও।

আম্মা খোঁজ নিতে যেতেন। আর ফিরে আসতেন। এইভাবে প্রতিদিন ফিরে এসে কান্নাকাটি করতেন। খালু আম্মাকে গাইড করতেন কোথায় যেতে হবে, কি করতে হবে।  আমার মনে আছে, ১৯৭১ সালে রাজশাহী শহরে পিস কমিটিতে যারা ছিলেন তাদের সংগে বিভিন্ন আত্মীয়দের মাধ্যমে আম্মা দেখা করেছিলেন সাহায্যের আশায়। কিন্তু কেউ কোনো সাহায্যে আসেনি। আমি কোথাও যেতে পারতাম না আম্মার সঙ্গে। কারণ আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্র। বয়সের ছেলেরা যুদ্ধ গেছে- তাই ওরা এই বয়সের সবাইকে  খুব সন্দেহের চোখে  দেখে। আমি গেলে মেরে ফেলবে।

দাদাকে দেখে মায়া লাগত। বৃদ্ধ মানুষ, ছেলের জন্য হন্নে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন যায়গায় যাচ্ছেন। এখনকার প্রজন্ম হয়তো ঠিক বুঝতে পারবেনা- কী দুঃসহ সময় ছিল তখন। সবাইকে বাস থেকে বিভিন্ন  চেকপোস্টে নামানো হচ্ছে। নারী, পুরুষদের আলাদা করা হচ্ছে। কলেমা পড়তে বলা হচ্ছে। আম্মার সামনেই একদিন বাস থেকে নামিয়ে একজন কলেমা ঠিকমত পড়তে পারেনি বলে সবার সামনেই গুলি করে মেরে ফেলল।  আম্মা প্রতিদিন ফিরে এসে সারাদিনের অবহেলা বঞ্চনার  গল্প করতেন। আমরা ভাইবোনেরা একে অন্যকে সান্তনা দিতাম, আর আশায় বুক বাঁধতাম- হয়ত একদিন আব্বার কোন খোঁজ পাওয়া যাবে.........

আমার দাদা বয়স্ক মানুষ। উনি ক্লান্ত। ঠিক হল, দাদা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন থাকবেন এবং বাড়ী থেকে চাল, ডাল এবং আনুষঙ্গিক তৈজসপত্র নিয়ে ফিরে আসবেন এবং আমার ছোট চাচা বাড়ী থেকে আসবেন। চাচার বয়স তখন ৩০, কিন্তু উনি আগ্রহ প্রকাশ করলেন আম্মাকে নিয়ে বিভিন্ন যায়গায় যাবার। উনার অনেক ঝুঁকি  ছিল, কিন্তু বড় ভাইয়ের জন্য উনি মরতেও রাজী। এই  অবস্থায় আম্মা সিদ্ধান্ত নিলেন যে উনি নাটোরে  আর্মি  হেডকোয়ার্টারে যাবেন চাচাকে সঙ্গে নিয়ে। এটি খুব সহজ সিদ্ধান্ত ছিলনা। ওখানে আমাদের টগর নানা অডিটর হিসাবে পোস্টেড ছিলেন। আব্বার এক সহকর্মী আবদুল্লাহ সাহেবও কর্মরত ছিলেন। ওখানে নানার বাড়িতে দুইএকদিন থেকে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে নাটোর কলেজে অবস্থিত আর্মি কাম্প- পিটিশন দেওয়া হয়। নাটোর  থেকে একদিন ফিরে এসে আম্মা বললেন, 'ভালো খবর হচ্ছে, এই প্রথম একজন আর্মি অফিসার আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছেন। নাটোরে ঠিক কোনখানে এখন আমার মনে নাই, আম্মা বলেছিলেন, যে উনি দূরে অপেক্ষা করছিলেন আমার চাচার সঙ্গে। সম্ভবত নাটোর কলেজে যেখানে আর্মি ক্যাম্প ছিল। অনেক দূর থেকে একজন অফিসার উনাদেরকে দেখে ডেকে পাঠালেন এবং আম্মাকে দেখে উনি বললেন যে, তুমি আমার মায়ের মত দেখতে। আম্মা উনাকে বললেন যে, 'আমার স্বামী নিখোঁজ এপ্রিল মাস থেকে। তাঁকে ডেকে পাঠানো হযয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী হাউসে এবং এরপর থেকে আমরা ওনার কোন খোঁজ জানি না। উনি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন সেটাও জানি না। উনি বললেন, আমার কাছে ছবি আর পুরো তথ্য রেখে যাও।  আমি খোঁজ নিবো। তোমাকে দেখে আমার মায়ের কথা মনে হয়েছে। আমি অনেক দিন মাকে দেখি নি। আমার মা  তোমার মত দেখতে। আমি চেষ্টা করব তোমার স্বামীর খোঁজ করতে। এই বলে পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে দিয়েছিলেন আসার খরচ হিসেবে।

যেভাবে বলেছিলেন সেভাবে কয়েকদিন পরে নাটোরে গেলেন সেই মেজর সাহেবের সঙ্গে দেখা করবার জন্য এবং যাওয়ার পরে যখন আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, কোন খোঁজ কি পাওয়া গেছে? মেজর সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,  'তুমি তোমার স্বামীর সঙ্ড়ে দেখা করতে চাও? আম্মা বলেছিলেন, 'উনি কি বেঁচে আছেন?উত্তরে  মেজর বলেছিলেন, 'বেঁচে না থাকলে দেখা করবে কিভাবে? বলেন, এখানে দেখা করানো যাবে না।

উনি একটা গাড়িতে আম্মা এবং দাদাকে নাটোর শহরের বাইরে ফুলবাগান বা ঝাউবাগান, আমার ঠিক মনে নাই  যেখানে আর্মি ক্যাম্প ছিল। এরকম কোন একটা যায়গায় যেটি শহর থেকে অনেক বাইরে, সেখানে নিয়ে যেতে বলেন।

আরেকটা ট্রাকে করে আমার বাবাকে নিয়ে আসা হলো। আম্মা চাচা অপেক্ষা করছেন। দূর থেকে আমার বাবাকে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং আম্মার একসময় মনে হয়েছিল যে, ভুল করে অন্য একজনকে নিয়ে আসা হয়েছে। আম্মা আমাকে বলেছিলেন, লম্বা দাড়ি শীর্ণকায় এক মানুষ, ভালোমতো চোখে দেখেনা- আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। অনেকটা 'সবার উপরেসিনেমার ছবি বিশ্বাসের মত দেখতে। আমাকে চিনতে পারলেন। বললেন, 'তুমি বেঁচে আছো? ছেলে-মেয়েরা কি বেঁচে আছে? আম্মার চিনতে অসুবিধা হচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরে না খেয়ে নির্যাতিত হয়ে এই অবস্থা। আমি তো সেই সময় কাছে ছিলাম না, তবুও আম্মার বর্ণনা শুনে মনে হয়েছে- এই যে দেখা হওয়া   সে এক হাসি কান্নার মুহুরত। খুশির বেদনার আনন্দে সবার চোখ দিয়ে ঝরছে অশ্রু। ঐখানে যে অবাঙালি হাবিলদার ছিল সে বাংলা জানত। ওকে পাঠানো হয়েছিল- খুব কাছ থেকে কি কথা হচ্ছিল সেসব শুনতে এবং রিপোর্ট করতে। আব্বা এটা বুঝতে পেরে আম্মাকে শুনিয়ে বলেছিলেন, এরা আমারকে ভালোভাবেই রেখেছে। বলেছিলেন,  আমার চোখের অবস্থা খুব খারাপ। আমি ওষুধের কথাটা আমার স্ত্রীকে লিখে দিতে চাই, যেন  আমি সুস্থ হতে পারি। হাবিলদার রাজি হলে সেখানে পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেটের উল্টোদিকে সেই  হাবিলদারের কলম দিয়ে আমার বাবা কাঁপা কাঁপা অক্ষরে আমাদের তিন লাইনের চিঠি লিখলেন, 'মুক্তা, মনজু, আনজু রনজু আমি বেঁচে আছি। তোমার মা বললেন, তোমরাও বেঁচে আছো। দোয়া করবে- আমি যেন ফিরে আসি এবং তোমাদের সঙ্গে আবার একসঙ্গে হতে পারি।

এর কিছুক্ষণ পরে ওরা আব্বাকে আবার বেঁধে নিয়ে চলে গেল। আম্মা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসলেন রাজশাহী। আমাদের কাছে গল্প করলেন, আমরা আনন্দের কান্না কাঁদলাম সব ভাইবোন মিলে একসঙ্গে।

তখন ১৯৭১ সালে, আমরা যারা যুবক ছিলাম, আমরা যারা লেখাপড়া করতাম সে সময়- আমাদের বের হওয়া কঠিন ছিল। আমরা খালু খালামা ছাড়া আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে কোনো বুদ্ধি তেমন পাইনি। তাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও তেমন ছিল না। আমার দুই মামা ইন্ডিয়া চলে গেছেন। বড় মামা পাবনায়। আমরা বসে ঠিক করতাম- যে কয়টা টাকা রোজগার করছি- সেই টাকা দিয়ে কিভাবে আমরা দিন চালাবো। আমার দাদা এই বৃদ্ধ মানুষ খুব কষ্ট করেছেন ছেলের জন্য, বউয়ের জন্য। নাতি-নাতনির জন্য নিদারুণ পরিশ্রম করেছেন। ছোট চাচা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আম্মাকে নিয়ে বাইরে যাচ্ছেন। একদিন  মারাই যাচ্ছিলেন। দাদার জন্য ভাত নিয়ে চাচা আর আমার খালাতো ভাই মাসুদ আসার পথে সিওবি মোড়ে আর্মি থামালো। জিজ্ঞাসা করলো, কোথায় যাও? উত্তরে সন্তুষ্ট নয়। একজনকে বলে, এদের দুজনকে গুলি করো।

দূরে আমাদের গ্রামের একজন সিপাই ভাগ্যক্রমে ডিউটিতে দাঁড়িয়ে ছিল।  সে এগিয়ে এসে কাকুতি মিনতি করে বলে, 'উনি আমাদের গ্রামের, সম্মানিত লোক। কি ভেবে ওরা মত পরিবর্তন করে ছেড়ে দিল। উনারা নুতন জীবন পেলেন।

এরকম কত কাহিনী। এই প্রজন্মের অনেকের কাছেই কল্পকাহিনী মনে হতে পারে।  

ঊনসত্তরের দিকে আমার এক বন্ধু আর্মির ক্যাপ্টেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটিতে এসে রাজশাহীতে বেড়াতে এসে কয়েকদিন ছিল। সেসময় ইপিআরের ক্যাপ্টেন ইসাহাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে পাঞ্জাবের মানুষ, কিন্তু একটু অন্যদের থেকে আলাদা। আমার সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ত্ব হয়ে গেলো। আমি ওর ওখানে যেতাম, আমাদের বাসায় আসতো। আব্বাকে খুব সম্মান করত। বলতো, ‘আমার পরিবারকে মিস করি, তোমার এখানে এলে আমার ভালো লাগে। আমার লাভ হল যে, এই ফাঁকে আমার ইংরাজি বলাটা সড়গড় হলো। একবার ১৯৭০ সালে আব্বা-আম্মাসহ আমাদের সবাইকে নিয়ে আর্মির গাড়িতে নাটোর রাজবাড়ী দেখাতে নিয়ে গেলো। সেটি খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা ছিল।  সে রাজনীতি বা পূর্ব পশ্চিম পাকিস্তানের যে বিভেদ- সেগুলি নিয়ে কোন সময় কথা বলতোনা। এমনকি মার্চের প্রথম সপ্তাহেও।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল একজনের মাধ্যমে, কিন্তু আসার সুযোগ পাচ্ছিলনা। এর মধ্যে মেজর পদে পদোন্নতি পেয়েছে। খবর পেয়েছে আব্বা বন্দী। একদিন এক EPCAP-এর SP কে নিয়ে বাসায় এল। দুজনে অনেক্ষণ আলাপ করল- কিভাবে আব্বাকে মুক্ত করা যায়।  খুব বিষণœ আমার মনে আছে, বারবার সেই পুলিশ অফিসারকে মেজর ইসাহাক উর্দুতে বলছে, 'আলতামাস সাহাব ইতনা শরিফ আদমি। ইতনা শরিফ আদমি, হাম কভি নাহি দেখা। ওর এত মন খারাপ যে, আমি থাকতে এরকম হল? আর আমি কিছু করতে পারছিনা! লজ্জায় আমার দিকে ভালোমত তাকাতে পারছে না।

উনারা কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলেন। এর পরে মেজর ইসাহাকের সঙ্গে আর দেখা হয়নি কয় মাস। মনে হয় অন্য  কোথাও বদলী হয়ে চলে গিয়েছিল। দেখা আর একবার হল ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর তারিখে। আমি আমদের পাড়ার বড় রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে আছি। পাকিস্তান আর্মির কনভয় নবাবগঞ্জের দিক থেকে সম্ভবত নাটোরের দিকে যাচ্ছে স্যারেন্ডার করতে। মেজর ইসাহাক এক জীপে বসা। আমাকে দেখে হাত তুলে সালাম দিল, হাত নাড়ল। জীপ এগিয়ে চলল।

আম্মা নাটোর থেকে ফিরে আসার পরে আর নাটোরের ওই মেজর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। আব্বা বন্দী আছেন, আমরা আমাদের আত্মীয়- এর মাধ্যমে জেলখানায় চাকরি করেন- এমন একজন কর্মচারির সঙ্গে  যোগাযোগ হল। উনি আমাদের বললেন, আমি আপনাকে খবরা-খবর এনে দেবো, এবং প্রয়োজনীয় জিনিস যদি লাগে, সেগুলি আমি ওনাকে দিয়ে আসব।

আব্বার চোখের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। উনার জন্য কিছু  ওসুধ, মাথায় দেওয়ার জন্য একটা বালিশ আর দু-একটা কাপড়-চোপড় দেওয়া হয়েছিল। ছোট ছোট কাগজে আমাদেরকে লিখে দিতেন, উপদেশ দিতেন। এটি আমাদের কাছে ছিল বিশাল মূল্যবান। উনি বেঁচে আছেন- এটা তার প্রমাণ। আমরা জানতাম না কিভাবে ওনাকে মুক্ত করবো। কোন পথ  খুঁজে পাইনা। আব্বা কি আর ফিরে আসবেন না? এই চিন্তায় আমাদের রাতের ঘুম হয়না। অনেকদিন আগে পড়া কবিতার কথা মনে হয়, ‘তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছি। তোমার অপেক্ষায়  কেটে গেল দীর্ঘ মাস। কত দীর্ঘশ্বাস পড়ল ক্লান্তশরীরে।

সম্ভবত জুন মাসের শেষের দিকে অথবা জুলাইয়ের প্রথম দিকে আম্মা দেখেছিলেন, আর্মি সেপাইদের সাঁতার  শেখানো হচ্ছে নাটোরের  কাছে এক পুকুরে যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি হিসাবে। ওরা তো সাঁতার জানে না তাই পানিতে খাবি খাচ্ছে। তখন মুক্তিযুদ্ধ দানা বেঁধেছে। পাকিস্তানী আর্মিরা বিভিন্ন জায়গায় মার খাচ্ছে। আমি রেডিওতে কাজ করে যাচ্ছি, এই সময হঠাৎ দেখি যে রেডিওতে  অনেক আর্মির লোকদের আনাগোনা। এক সময়ে দেখলাম, লাল টুপি পরা সেনাবাহিনীর লোকজন এসে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি করছে। একে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, জানলাম ডিভিশনাল হেড কোয়ার্টার থেকে এই অঞ্চলের প্রধান মেজর জেনারেল পদবীর একজন সেনা কর্মকর্তা এখানে আসবেন।

নানাভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার পরে আমাদের তারিখ জানানো হলো। নির্দিষ্ট দিনে উনি আসবেন। ভিআইপি স্টুডিওতে আমরা সবাই বসে থাকবো। উনি কক্ষে প্রবেশ করলে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে সালাম দিব, এবং উনি আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ দিবেন। আব্বা বন্দী অবস্থায় বেঁচে আছেন এটুকু জানি, কিন্তু উনি কি আদৌ ছাড়া পাবেন, না ওরা উনাকে মেরে ফেলবে- এইসব চিন্তায় আমি তখন দিশাহারা। মৃত্যু তখন খুব সহজ ব্যাপার। এই বিষয়টি এখনকার প্রজন্ম ঠিক বুঝতে পারবেনা।

এই ভয়ানক অবস্থা। আমি তখন মরিয়া। এই সময়ে আমি একদিন সাইফুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। উনি আমাকে বললেন, 'তুমি কি কিছু বলতে চাও?' কেমন করে সাহস পেলাম আমি জানি না। আমি ওনাকে বললাম, 'স্যার আপনার অনেক ক্ষমতা। আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আব্বাকে মুক্ত করতে পারেন। আপনি কি  জেনারেলের কাছে সুপারিশ করবেন এই বলে যে- তার ছেলে এখানে কাজ করে। আমি ওর বাবাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। ওর বাবাকে বিনা অপরাধে আটক করা হয়েছে এবং পরিবার উনার আর কোন খবর জানেনা। আপনার কাছে আমার মাধ্যমে ফরিয়াদ করেছে যেন উনাকে মুক্ত করা হয়।

উনি আমার কথা শুনলেন। অনেক্ষণ চিন্তা করে আমাকে বললেন, 'দেখো এইসব জেনারেলদের মেজাজ মর্জি কোন ঠিক থাকেনা। আমি তো তোমার প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি না, তবে এটুকু বলতে পারি- যদি দেখি জেনারেল সাহেবের মেজাজ অনুকূলে, আমি এই ব্যাপারটা ওনার কাছে তুলে ধরব।এই কথা বলে শেষ করলেন। আমি ভাবলাম এটি কথার কথা আমাকে একটা সান্তনা দিলেন। কারণ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একজন জেনারেলকে এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আলাপ করা চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক সাহসের দরকার, আর আমার জন্য উনি এই বাড়তি ঝুঁকি কেনই-বা নিবেন?  যাই হোক আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের আমার ঠিক মনে  নেই, নির্দিষ্ট দিনে আমরা অপেক্ষা করছি বিশাল বপুর  মেজর জেনারেল নজর হুসেন শাহ, একজন আর্মি অফিসার, আর রিজিওনাল ডাইরেক্টর- এরা  তিনজন কক্ষে প্রবেশ করলেন। যাই হোক  পরে জেনেছিলাম, সেই ভদ্রলোক জেনারেলের এডিসি, একজন ক্যাপ্টেন। একটা পূর্ব পাকিস্তানের ম্যাপ দেয়ালে টাঙ্গানো হল। জেনারেল ভাষণ শুরু করলেন এবং বললেন, মুক্তিযুদ্ধ কি? কোরিয়ায় উনার নিজের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার গল্প করলেন। এরপরে উনি বললেন, 'যেন হিন্দুদের হাতে না চলে যায় এই দেশ, সেই লক্ষ্যে আমরা যুদ্ধ করছি। এই গেরিলারা চিড়া মুড়ি  খেয়ে কি যুদ্ধ করবে? আমরা সামনের ঈদ ইনশাআল্লাহ কলকাতায় করব। বেশিরভাগই ছিল উর্দুতে, মাঝে মাঝে কিছু ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছিলেন। একসময় উনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কারো যদি কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে আমাকে আপনারা নির্ভয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। একজন প্রশ্ন করেছিলেন, 'আমরা এখানে কাজ করছি সরকারের, কিন্তু আমাদের আত্মীয়-স্বজন গ্রামে বাস করে। ওখানে  মুক্তি বাহিনী কোন ব্রিজ উড়িয়ে দেবার পরে আপনার আর্মি এসে সব ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। জেনারেলের হটাৎ  করেই খুব ক্ষেপে গিয়ে বললেন, 'আমাদের আর্মি কখনই কাজ করেনা। কিন্তু তোমাদের দায়িত্ত্ব মুক্তিবাহিনিকে বাধা দেওয়া। আমরা সবাই সেই ভদ্রলোকের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। উনি  বক্তৃতা শেষ করে চলে গেলেন উপরতলায়, আরডি সাহেবের অফিস কামরায় আমি ভাবলাম, জেনারেলের মেজাজ খারাপ। আরডি সাহেব হয়তো আর আমার ব্যপারটা তোলার সাহস পাবেন না। আমরা যে যার মত কাজ করছি। চুপচাপ বসে আছি সবাই। ভয়ে আছি যদি পান থেকে চুন খসলে কোন বিপদ হয়। একসময় দেখি ক্যাপ্টেন নেমে আসছে। আমি দূরে ছিলাম। কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে আশরাফ আহমেদ কে? আমি কাছে যেতেই উনি আমাকে ইংরেজিতে বললেন, 'আমার নাম ক্যাপ্টেন আশিফ। তোমাদের ডাইরেক্টর আমাদের  জেনারেল  সাহেবের কাছে একটি বিষয় তুলে ধরেছেন।  আমাকে জেনারেল সাহেব বলেছেন ব্যাপারে খোঁজখবর করতে। আমি একটা ঘরে বসে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তাড়াতাড়ি একটা ঘর খালি করার ব্যবস্থা হলো। রেডিও স্টেশনের  সবাই চুপচাপ। ভাবছে হয়ত আমি কোন অপরাধ করেছি, সে কারণে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমাকে উনি বললেন, 'তুমি কি করো? আমি জানালাম আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বললেন, তোমার বাবার কথা বলা হয়েছে। কি হয়েছিল?' আমি বললাম, 'আমার বাবা পুলিশে চাকরি করতেন। উনি দিনাজপুরে চাকরিরত ছিলেন এবং যুদ্ধ শুরু হলে উনি রাজশাহী চলে আসেন এবং চাকরিতে যোগ দেন। আমাদের পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনাতির সংগে সম্পৃক্ত, হয়তো সেই কারণে কেউ শত্রুতা করে আর্মিকে খবর দিয়েছে।  কিন্তু আমার আব্বা কোন রাজনীতির সংগে জড়িত ছিলেন না। উনি  সরকারি চাকরি করে গেছেন সারাজীবন। আমাকে ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন, 'আমরা কি ভাষায় কথা বলবো?' আমি বললাম, 'আমি উর্দু ভালো বলতে পারিনা, তবে ইংরেজিতে কথা বলতে পারব। কথাবার্তা হচ্ছিল ইংরেজিতে। জিজ্ঞাসা করলেন,'উনার কোন ছবি আছে তোমার সংগে?' আমি বললাম, 'আমার কাছে তো নাই, বাসায় একটা-দুটো থাকতে পারে। উনি আমাকে হঠাৎ করে বললেন, 'আমি তোমার বাসায়  যেতে চাই।

আমার মনে হয়, আমাদের পারিবারিক অবস্থার কথা জানতে চাচ্ছেন ভালোভাবে। আর্মির / টা গাড়ি রেডি করা হলো। রওয়ানা হলাম। পাড়ার অর্ধেক লোক দূরে পালিয়ে গেল। বাসায় কেউ ছিল না। ওই দিন কোন কারণে আম্মা ভাই-বোনদের নিয়ে খালার বাসায় ছিলেন। আমরা বাইরের ঘরে বসলাম। আমি  এলবাম থেকে একটা ছবি  বের করে দেখালাম। তারপর তিনি আমাকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। আমাদের পারিবারিক আবহের কথা, পারিবারিক অবস্থানের কথা, আমি কি করছি, আমি ভবিষ্যতে কি হতে চাই? আমি উত্তরে বলেছিলাম, ভবিষ্যতে কি হতে চাই সেটা তো পরের কথা। আমার বাবা যদি না ফিরে আসে, তাহলে আমাকে সংসারের দায়িত্ব নিতে হবে। হয়তোবা আমি আর পড়াশোনা শেষ করতে পারবোনা। কেরানি হয়ে সংসার চালাতে হবে। আব্বা বেঁচে আছেন এবং আম্মার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছে- সে কথা আমি উনাকে বলিনি। ক্যাপ্টেন আমার কথা খুব মন দিয়ে শুনছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, উনি আমার কথা বিশ্বাস করেছিলেন। আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম এসব কথা বলার সময়। দেখা গেলো আমরা দুজন একই বয়সের ১৯৬৮ তে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে উনি আর্মিতে গিয়েছিলেন, আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিলাম।

ক্যাপ্টেন উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ করে আমাকে আলিঙ্গন করলেন। আমাকে ইংরেজিতে বলছিলেন, 'এভ্রিথিং উইল বি অলরাইট, ইনশাআল্লাহ। আমাকে বললেন, 'আমি গিয়ে রজনারেল সাহেবের কাছে- তোমার বাবা যাতে মুক্তি পান, সে ব্যাপারে সুপারিশ করব। কখন করতে পারবো আমি জানিনা, উনি ব্যস্ত মানুষ। আমি সুযোগ করে  তার সঙ্গে এটা নিয়ে আলাপ করব। আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখব।

আমরা রেডিওতে ফিরে আসলাম। ক্যাপ্টেন আসিফ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলেন। আধ ঘণ্টা পরে সবাই একসঙ্গে  নেমে রওনা হলেন নাটোরের পথে। এরপরে সবাই আমাকে চেপে ধরল, 'ভাই আপনি বেঁচে আছেন? আমরা তো ভাবলাম যে, আপনি বোধ হয় শেষ। কি কথা হলো?' আমি  বললাম, 'আমাকে জিজ্ঞেস করছিল তার কিছু তথ্য জানার ছিল আব্বার বিষয়ে, সেগুলি নিয়ে প্রশ্ন করলো।

যাই হোক, সাইফুল্লাহ সাহেব আমাদের জন্য তো এই কাজটুকু করলেন। তার কি দরকার ছিল আমার মত একটা নগণ্য মানুষের জন্য ঝুঁকি নেবার! এরপরে আমি কাজ করছি আর ভাবছি ক্যাপ্টেনের কথাগুলি। ভাবলাম, এদের কথার তো কোন ঠিক নাই, হয়তো ভুলেই গেছে। আমি রেডিওতে কাজ করছিলাম। সপ্তাহ খানেক পরে, বেলা এগারোটার দিকে  ফোন এলো, আমার সঙ্গে কথা বলতে চান ক্যাপ্টেন আসিফ। আমি ফোন ধরলাম। উনি আমাকে বললেন, 'আমি তোমার বাবার খবর নিয়েছি। তোমার বাবা বেঁচে আছেন, নাটোরে আছেন। আমি   জেনারেল সাহেবের সঙ্গে কথা বলব, যাতে উনি মুক্তি পান। আমি তোমার প্রতি সহানুভূতিশীল। [যাই হোক- এরপরে ক্যাপ্টেন আসিফের সঙ্গে আমার আর কোনদিন কথা হয়নি। আমি তার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, তাকে অনেক খুঁজেছি ফেসবুকে দেখেছি। কিন্তু আমি কোন খবর নিতে পারিনি। বেঁচে আছেন, না মারা  গেছেন জানি না।]

এর মধ্যে আমাদের জীবন চলছে। নাটোরের জেলখানায় চাকরিরত সেই ভদ্রলোকের মাধ্যমে আব্বা ছোট ছোট চিরকুট পাঠাচ্ছেন। সেগুলো আমাদের কাছে কিভাবে এসেছিল- এটা আমার ঠিক মনে নাই। ৫০ বছর আগের কথা। স্মৃতি অনেক সময় সাড়া দিচ্ছে না। অনেক কিছুই খবর পাচ্ছিলাম। এটুকু খবর পেলাম, আব্বার শারীরিক উন্নতি হয়েছে। যে ওষুধগুলো পাঠানো হয়েছিল, তাতে চোখের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তিনি আদৌ ছাড়া পাবেন কিনা- সে খবর তো আমাদের কেউ বলতে পারছে না। আমরা আশায় দিন গুনছি, আর স্বপ্ন দেখছি  নীরেন চক্রবর্তীর কবিতার মত-

অন্ধকারের বুকেও স্বপ্ন লুকিয়ে রাখি

 নৈশ ভয়ের ভিত্তি  খুঁড়ে। ধ্বস্ত বাড়ির

বিশাল কামরা যখন খোলে,

তখন আমরা স্বপ্ন আঁকি,

তার ভিতরেও স্বপ্ন আঁকি।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ পর্ব :  মাঝে মাঝে রেডিওর খবরে বলা হয় যে, কিছু মানুষকে সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করে ছেড়ে  দেওয়া হয়েছে। এর আগেও এরকম ঘোষণা শুনেছি, কিন্তু আমাদের পরিচিত কাউকে ছাড়া পেতে দেখিনি।

সেদিন খুব ভোরে রেডিওর প্রথম ট্রান্সমিশন শুরু হয়। আমার ডিউটি ছিল। ওখানে খবরে শুনলাম যে, প্রেসিডেন্ট  সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। কিছু বন্দীদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমি বাসায় এসেছিলাম কোন একটা কাজে। আম্মা  খবরটি শুনেছেন। আমাকে বললেন, 'জানো আজকে অনেককে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তোমার আব্বা যদি ছাড়া পেত, কত না ভালো হতো। আমি বললাম, 'আম্মা  এরকম ঘোষণা এর আগে অনেকবার শুনেছি, কিন্তু কাউকে ছাড়া হয়নি। 

আমি আবার রেডিওতে ফিরে গেলাম। কাজ করে ফিরে আসলাম। মনে আছে, ১০ অক্টোবর সন্ধ্যেবেলা আমরা সবাই বাসায়। এমন সময় আমার খালাতো ভাই মারজুক সিরাজুল ভাই আমাদের বাসায় এলেন সাইকেল নিয়ে। বললেন, 'খালাম্মা আপনি আমাদের বাসায় চলেন। একজন আর্মি অফিসার এসেছে, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায় খালুর ব্যাপারে। আপনি সঙ্গে সবাইকে নিয়ে চলেন আমাদের ওখানে। আম্মার মনে বিভ্রান্তি, কেন আমার  বোন আনজুকে নিয়ে যেতে হবে? আমরা তো সবসময় ওকে নিয়ে চিন্তা করি- যেন আর্মিরা বুঝতে না পারে বাড়িতে এই বয়েসের মেয়ে আছে। আমিও রাজী না। আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে ওরা বলল, 'খালু ফিরে এসেছেন। ওরা আম্মাকে হটাৎ করে বলতে চাচ্ছেনা। আমার কি অনুভুতি হচ্ছিল- সেটা আমি ঠিক  বোঝাতে পারবোনা। মনের মধ্যে বাজনা বাজছে। চিৎকার করে আনন্দ করতে ইচ্ছা করছে। খুশীতে কাঁদতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু কাউকে বলতে পারছিনা।

রিকশায় করে কাদিরগঞ্জের পথে  আম্মাকে  বললাম, 'আম্মা এমন যদি হয় যে যেয়ে দেখি আব্বা ফিরে এসেছেন। আম্মা বললেন, 'আমাদের কি সেই ভাগ্য হবে?' কাদিরগঞ্জে খালার বাসায় পৌঁছে দেখি- লোকে  লোকারণ্য। পাড়া ভেঙে সবাই এসেছে। বারান্দায় আলো আঁধারে দাঁড়িয়ে আছেন লম্বা দাড়িওয়ালা এক অচেনা মানুষ। কাছে যেতেই দেখি আব্বা দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদেরকে দেখে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, 'তোমরা এসেছো?' আম্মা আব্বাকে দেখে ইটের উপর পড়ে মাথা ফেটে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। আমরা ভাইবোনেরা আব্বাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। আমি ঠিক বোঝাতে পারব না তখনকার অনুভুতি।

যাই হোক, সেখানে উপস্থিত ছিলেন আমাদের নানা। উনি বললেন, 'আল্লাহর কাছে শুকরানা নামাজ পড়তে হবে।  তোমরা সবাই ওজু করে এসো। নানা ইমামতি করলেন। আমরা পুরুষেরা সবাই শোকরানা নামাজ পড়লাম। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। আব্বাকে আমরা সারাজীবন দেখেছি একজন স্বল্পভাষী মানুষ হিসেবে, কিন্তু সেই রাতে উনাকে কথায় পেয়েছিল। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। বলছেন, ' জালিমরা শেষ হয়ে যাবে। এদের পতন খুব শিগগির হবে। তোমরা দেখে নিও। একই কথা বারবার বলছেন। আমরা ওনাকে থামাতে পারছিনা। অনেক রাত হয়ে গেলো। আমরা আমাদের কাজিহাটার বাসায় ফিরে এলাম। অনেক রাত পর্যন্ত  উনি বার বার বলছেন, 'এদের পরিণতি খুব খারাপ হবে। এরা মানুষ নয়। পরদিন  দেখি, শরীর খারাপ। এরপর দিন  থেকে দেখি, উনি আর কথা বলছেন না। একদম চুপ, কিছুই বলছেন না।  সারা শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন। এক কাপড়ে এই কয়েকটা মাস। 

আব্বাকে যখন নাটোরের কারাগার থেকে ছাড়া হয়, তখন উনাকে একটা কাগজ দেয়া হয়। সেখানে লেখা ছিল, 'এত তারিখ থেকে এত তারিখ পর্যন্ত উনি বন্দী ছিলেন। এটাকে ছুটি হিসেবে ধরে নিয়ে আবার উনি কাজে যোগ দিতে পারবেন। আর বাড়ি ফেরার জন্য দশটি টাকা দেওয়া হয়েছিল।

কাগজটি দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে উনি ছুটির আবেদন করলেন। উনি  লিখলেন, 'শরীর খুব খারাপ। কাজে যাওয়ার মত অবস্থা নাই। আব্বার কাছে শুনেছিলাম, সেদিন রাজশাহী শহরের মোট চারজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কারা তারা- সেটা আমি জানিনা। হঠাৎ করে খবর পেলাম, চারজনের দুজনকে আলবদর বাহিনীর লোকেরা এসে ধরে নিয়ে গেছে। তারা আর ফিরে আসেনি। একথা শুনে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আব্বাকে পাড়ার আর এক বাড়িতে লুকিয়ে রাখলাম।

এভাবে যুদ্ধ শেষের দিকে  ভারতীয় ছত্রী বাহিনীর প্লেন দেখছি আকাশে ঊড়ছে। চারিদিকে শুনছি, যুদ্ধ শুরু হয়ে  গেছে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনী যৌথ কমান্ডের সঙ্গে। পাকিস্তান বাহিনীর পিছু হটছে।  ভারতীয় প্লেন থেকে কিছু হ্যান্ড বিল ছাড়া হল। সেখানে লেখা আছে উর্দুতে, 'হাতিয়ার ডাল দো। এটি একটি আদেশ- পাকিস্তানি  সেনাবাহিনী এবং অঙ্গ সংগঠনের সবার উদ্দেশ্যে। একটি বাণী সেখানে লেখা আছে, 'তোমাদেরকে চারিদিক থেকে আমরা ঘিরে ফেলেছি। তোমরা যুদ্ধ শেষ করো। অস্ত্রসমর্পণ কর। আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি- তোমার পরিবারের কাছে তোমাদেরকে আমরা ফিরিয়ে দেবো।

১৬ তারিখে দেশ স্বাধীন হলো। রমনা রেস কোর্সে  যুদ্ধবিরতি চুক্তি হোল। কিন্তু রাজশাহীতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আর্মি ফিরে আসার কারণে সম্ভবত ১৮ ডিসেম্বের  রাজশাহীতে আত্মসমর্পণ করলো। আমরা বড় রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।  দেখলাম পাকিস্তান আর্মির কনভয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিক   থেকে আসছে। দেখলাম এক জিপে মেজর ইশাহাক বসে আছেন। আব্বাকে দেখে হাত তুলে সালাম দিলেন।

এরপরে স্বাধীন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে এল। আমাদের সূর্যসন্তানরা সবাই ফিরল। চারিদিকে আনন্দ অনেক। আমার পাড়ার ছেলেরা যারা যুদ্ধে গিয়েছিল- তাদের সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। সবাই জানে আব্বা বন্দী ছিলেন দীর্ঘদিন। রেডিওর লোকের আসছেন। পত্রিকা থেকে ইন্টারভিও নেবার জন্য সাংবাদিকরা আসছেন। সম্বর্ধনা দেওয়ার জন্য লোকজন আসছেন। আব্বা সবাইকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। বলছেনআমার কিছু বলার নাই। আমি একদিন আব্বাকে বললাম, 'আব্বা যুদ্ধের সময় কি হয়েছিল, আপনার বন্দিকালীন সময়ের কথা- আপনি আমাদেরকে কোন সময় কিছু বলছেন না। সবাই আসছে, আপনার কাছে শুনতে চাচ্ছে, কিন্তু আপনি কিছুই বলতে চাচ্ছেন না। উনি বেশিরভাগ সময়ই চুপ করে থাকতেন। আমি একদিন আবার একথা বলার জন্য গিয়েছিলাম। উনি হঠাৎ করে রাগ করলেন আমার উপর। উনি আমাকে বললেন, 'তুমি কি জানো, আমার বাপু আমাকে জীবনে একটা চড় মারেন নি। আমার সঙ্গে  খারাপ ব্যবহার করেন নি। এরা আমাকে অপমান করেছে, আর তুমি আমাকে বলছো- আমি সেই অপমানের কথা লিখি। আমি কথা লিখতে পারবোনা।

এরপরে উনি দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন, কিন্তু সেই সময়ের বন্দিজীবনের কথা আর কোনদিন বলেন নি। আমরাও আর উনাকে জিজ্ঞাসা করিনি। ২০০৯ সালের ২৪ শে জানুয়ারী আমাদের সবার মায়া কাটিয়ে আব্বা পরলোকে চলে যান।  আব্বা মারা যাবার কয়েকদিন পরে আমার আমেরিকা প্রবাসী ছোট ভাই মনজু হঠাৎ করেই পুরনো কাগজের মাঝে একই বছরের আব্বার  দুটি ডায়েরি খুঁজে পায়। যেখানে আব্বা উনার  জীবনের না বলা কথাগুলি কিছ্টুা হলেও লিখে গেছেন। এখানে উনার জন্ম থেকে শুরু করে, পড়াশোনা, চাকরীজীবন, জীবন সংগ্রামের কথা, আমাদের ভাইবোনদের জন্ম, বড় হওয়ার কথা বিস্তারিতভাবে লিখে গেছেন। এখানে  মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বন্দি জীবনের কথা উনি লিখেছেন। বিস্তরিত নয়। তবুও সেখান থেকে কিছূটা জানা যায়-  সেই দুঃসহ বন্দী জীবনের দিনগুলির কথা। এটিকে আমরা পুস্তক আকারে প্রকাশ করি। নাম দেই 'স্মরণের  আবরণে এই ডাইরিটা উনি  দীর্ঘদিন ধরে লিখেছিলেন। জীবনের কথা, ছেলে বেলার কথা লিখে গেছেন। কিন্তু কেন যেন উনি আমাদেরকে, এমনকি আমাদের আম্মাকেও বলে গেলেন না- আমি জানিনা। যাইহোক ভাগ্যক্রমে এটি আমরা পেয়েছি। এটি আমাদের পরিবারের কাছে এক বিরাট সম্পদ। যদি কোনদিন সুযোগ হয়- এই ডাইরিতে কি লিখেছিলেন, সেগুলি আমি সবার সামনে তুলে ধরবো। আজকে শুধু একটি পরিচ্ছদ শুধু আপনাদেরকে শোনাবো, যেখানে সেই সময়ের দিনগুলির কথা লেখা রয়েছে, 'আমি তখন কাজিহাটায় আহমেদ ভিলার বাড়িতে একা থাকি। পাশের বাড়িতে লাকির আব্বা, ইনকাম ট্যাক্স অফিসার নুরুল ইসলাম রাতে আমাকে দাওয়াত করেন। খাওয়ার পরে বাসায় ফিরছি। সেই সময় দেখি, গলির মুখে রাস্তায় মিলিটারি, খাকি পোশাকে কিছু মানুষ। হয়তোবা আমার অনুসন্ধান করতে এসেছিল। সেই ভয়ে আমি বাসায় না থেকে অন্য বাসায় থাকি। আমি  পরদিন অপেক্ষা করছিলাম পোস্টিং অর্ডারের। এমন সময়  অ্যাডিশনাল এসপির পিয়ন এসে আমাকে তাঁর বাংলোতে ডেকে নিয়ে যায়। ডিআইজি হাসান মাহমুদ এসপি আবদুল মজিদকে মেরে ফেলার পরে অ্যাডিশনাল এসপি চার্জে ছিলেন। আর্মিকে সহযোগিতা করতেন শুনেছি। বেঁচে আছেন, ঢাকায় ব্যবসা করেন। তিনি আমাকে বললেন, আপনি উনিভারসিটিতে জুবেরী হাউসে আর্মি ক্যাম্পে মেজর সাহেবের সঙ্গে দেখা দেখা করেন। সেখানে আমি বিকালে পৌঁছাই। মেজরের সঙ্গে দেখা করলে জিজ্ঞাসা করেন, কিভাবে আমি দিনাজপুর থেকে নবাবগঞ্জ গিয়েছিলাম।  আওয়ামী লীগের ডা.  মেসবাহুল হকের সঙ্গে কি সম্পর্ক? আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কিনা?' আমার সব উত্তর শুনে সন্ধ্যার পূর্বে দোতালায় একটি ফাঁকা ঘরে নিয়ে বন্দী করে রাখে। সেখানে দেখতে পাই, ঘরে কিছু ফোল্ডিং ব্যাগ রাখা আছে এবং মেঝেতে  রক্তের দাগ। মনে হয় পূর্বে মানুষকে অত্যাচার করত। সেই সময়টি ছিল ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ। পেরের দিন হতে দুই-একজন করে করে বন্দি নিয়ে এসে রাখতে থাকে। তাঁদের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রফেসর ডক্টর সালাউদ্দিন (পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডক্টর মুজিবুর রহমান, রাজশাহী জেলার তৎকালীন বাগমারার ওসি আবদুল্লাহ চৌধুরী (পরবর্তীতে অ্যাডিশনাল এসপি হয়ে অবসর গ্রহণ), এবং ছাত্র সাধারণ মানুষ ছিলেন। কাউকে রাতে নাম ধরে ডেকে বাইরে নিয়ে গেছে।তারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিঙের পেছনে গুলির শব্দ শোনা যেত। এভাবে সাত দিন আমাদেরকে জোহা হলের দোতালায় রেখে ইন্টারোগেশান শেলে টর্চার করত। পরে আমাদের নাটোর সাবজেলে নিয়ে রাখে। সেখানে একটি ছোট ঘরে গাদাগাদি করে অন্তত ৫০ জনকে রাখত তাদের খেয়াল মত বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার চালাত। প্রায় এক মাস পর আমাদের কয়েকজনকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। সেখানে আমাদেরকে মাত্র এক দিন রাখার পর আবার রাজশাহীর  নাটোর সাবজেলে ফিরিয়ে আনে।

কিছু কথা : আব্বার শৈশব জীবনের কিছু কথা বলি। গোমস্তাপুর থানার এক নিভৃত গ্রামে ১৯২৪ সালে এই শিশুটির (আব্বা) এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে জন্ম হয়। সেইসময়ে মুসলমান সমাজে লেখাপড়ার কোন গুরুত্ব ছিলনা। নিজের  চেষ্টায় লেখাপড়া করে উনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই সময় গ্রামে স্কুল ছিল না। খুব ছোট অবস্থায় ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় উনাকে চলে আসতে হয় ভালো স্কুলে পড়ার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে। এরপরে কানসাট স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে রাজশাহী কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করে চাকরিতে জয়েন করেন। আর তাঁর গ্রাম ফেরা হয়নি। সারা জীবন নীতি, আদর্শ আর সততা- এই ছিল উনার জীবনের মূলমন্ত্র। মাঝে মাঝে আমি যখন ভাবি, একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে নিজের নিজের চেষ্টায় আমাদের পরিবারের অন্যান্যদের কাছে অসাধারণ হয়ে উঠলেন? আমরা চার ভাইবোনেরা তার গুণাবলীর হয়তো কিছুই পাইনি, তবে এখনও উনার  দেখানো পথে আদর্শের পথে, সততার পথে আমরা চলছি। এই হচ্ছে একজন সাধারণ মানুষের আমাদের কাছ  থেকে  প্রস্থানের কথা।

         আশরাফ আহমেদ মুক্তা : প্রশিক্ষিত উদ্ভিদবিদ চা-বাগান ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ

 

 


 

 



                                                                        
 

 

0 Comments: