ভ্রমণ
ছবির মতো সাজানো বেইজিং
ইয়াসমিন হোসেন
তাকালেই অবাক দৃশ্য। ছবির মতো। সাজানো গোছানো। রীতিমত রঙ্গিন। বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল দেশ, কিন্তু রাস্তাঘাটে কোন ভিড় নেই। জ্যাম নেই। রাস্তা যেন এক-একটা সুবিশাল ঘোড়দৌড়ের মাঠ। পায়ে হেঁটে এপার-ওপার হতে প্রায় মিনিটখানেক লেগে যায়। দুই পারে থাকা সবুজ সিগন্যাল বাতি জ্বললেই কেবল পারাপার হওয়া যায়। সিগন্যাল বাতি লাল না হওয়া পর্যন্ত (পারাপার পথে মানুষ থাকুক না থাকুক) সব ধরণের যানবাহন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। সবকিছুই অত্যাধুনিক এবং বিদ্যুতচালিত। এনালগ বলতে কিছু নেই। আর, যা কিছু আছে সব ঝকঝকে তকতকে। কোন ধুলো-বালির অস্তিত্ব নেই। অকল্পনীয় মসৃন সড়কগুলোতে নানা রঙের হরেক রকম যানবাহন। বৈদ্যুতিক বাইক। মানুষগুলোও আরও রঙ্গিন, ঠিক পুতুলের মতো। এমনিতেই এরা দেখতে অতি সুন্দর। পরণে চমৎকার চমৎকার বাহারি পোশাক। কোন ময়লা নেই। ভাজও নেই। যেন এক্ষুণি ইস্ত্রি করে পরিধান করা হয়েছে।
সড়ক ও যানবাহনগুলোতে অসম্ভব সুন্দর চেহারার এইসব তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, নারী-শিশু, এবং খুব কম সংখ্যক বয়স্ক মানুষ চলাচল করেন ছবির দৃশ্যের মতো। প্রচুর গাছপালা, আকাশচুম্বি চোখ ধাঁধানো দালানকোটা। সবকিছুই খুব সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করা। যা কল্পনার রঙ্গিন ছবির মতো। অথচ এখানে এটাই বাস্তব।
বলছি- বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল দেশ চীনের কথা। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা ১৪৫ কোটির কাছাকাছি। দেশের রাজধানী বেইজিং। রাজধানী মানেই গোটা দেশের প্রাণকেন্দ্র। স্বভাবতই সব দেশের রাজধানী জনবহুল এবং অতি ব্যস্ত এলাকা হয়ে থাকে। বেইজিংও জনবহুল এবং ব্যস্ত শহর। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো- চারদিকের দৃশ্য, মানুষের চালচলনসহ সবকিছুতে এসবের কোনটাই নেই। সব চলছে অতি শান্ত এবং ধীরে সুস্থে। যেন ধীরে চলা রঙ্গিন ম্যুভি। চলছে একটা অদ্ভুৎ ছন্দে। কোলাহল নেই, যানবাহনের হর্ন নেই, কাওকে মারিয়ে আগে যাওয়ার প্রবণতা নেই। অটোমেটিক সিগন্যাল বাতিগুলো যেভাবে সংকেত দিচ্ছে, সেভাবেই গোটা ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। এতো লোকের দেশ, ফলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখানে সেই দিকটি নেই। অস্বাভাবিকতা কী জিনিস- সেটা বোধহয় এখানকার কেও জানেও না, করেও না। চীন ভ্রমণে এসে সপ্তাহ ধরে দেখে দেখে এটাই বুঝেছি।
আগেই বলেছি- এখানে সবকিছুই বিদ্যুতচালিত এবং অটোমেটিক। গাড়ি চলছে বিদ্যুতে। বাইক, বাইসাইকেল, ট্যাক্সি, বাস, ট্রেন সব চলছে বিদ্যুতে এবং বলা যায় একেবারেই শব্দহীনভাবে। হোটেল, রেস্তোরা এবং শপিং মলগুলোতে নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতে মানুষের বদলে রোবটকে ঘুর ঘুর করতে দেখেছি।
দেখতে পেয়েছি- অ্যাতোটুকুন বাচ্চা- মুখ দিয়ে কথা ফোটেনি; কিন্তু এদেরকেও শিক্ষালাভের জন্য গুদিগুদি পায়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। মা-বাবা বা স্বজনদের কেও বাইকে করে, কিংবা হাত ধরে হাঁটিয়ে স্কুলের বাসে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। এভাবেই এই ক্ষুদেরা জন্ম থেকে সত্যিকারের মানুষ এবং বিবেকবান হয়ে আদর্শ কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী হয়ে উঠছে।
এখানে সবাই সুশিক্ষিত এবং সবাই কাজ করে চলা মানুষ। কেও বসে থাকেন না। বুড়োরা অবশ্য সমাজতান্ত্রিক বিধান অনুযায়ী চলেন। বলা ভাল- এ দেশ কিন্তু কোন ধর্মভিত্তিক দেশ নয়। সহজ কথায় এদেশ ‘নাস্তিক’ দেশ। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন ধর্মের স্থান এখানে নেই। মানুষগুলো এই নীতিই অনুসরণ করেন। ধর্মচর্চা কাকে বলে- সেটা হয়তো তাঁরা জানেনই না। সে কারণে সরকারিভাবে তৈরি করা কোন মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গীর্জা এখানে নেই। এসব কারণে জীবন-যাপনে কোন অপচর্চার সুযোগ তৈরি হয়নি।
চীনকে একচোখে উপর থেকে দেখলে বড় ভুল হবে। কারণ মাটির উপরে যা রয়েছে, তার সমপরিমান বা তারচেয়েও বেশিভাবে রয়েছে মাটির নিচে। এই মাটির নিচটা যেনতেন নয়। কতো তল নিচে ভবন মেট্রোট্রেন স্টেশন, মার্কেটসহ নানান স্থাপনা রয়েছে- তা কল্পনাও করা যায় না। আমরা (আমি এবং আমার স্বামী) মেট্রো ট্রেনে শত শত কিলোমিটার ঘুরেছি মাটির নিচ দিয়ে। বিভিন্ন স্টেশনে নেমে মার্কেট বা স্থাপনা ঘুরেছি। সবই মাটির নিচে ছবির মতো করে সাজানো।
এখনকার মানুষ খাবার-দাবারে অন্যরকম। এঁরা সবকিছু খায়। আমরা যা কখনই খেতে পারবো না, বা খাওয়ার কথা ভাবতেও পারবো না- সেগুলোই এঁদের খাদ্য। আমাদের জন্য এ কারণে এখানে খাওয়া-দাওয়ায় খুবই সমস্যা হয়েছে। ওঁরা পোকা-মাকড়, নানান জীব-জন্তু খেয়েই মহাবুদ্ধিমান হয়েছে। বুদ্ধিমান বলেই না চীনকে তাঁরা বুদ্ধি দিয়ে সাজিয়েছে। এখানে কোন গরীব নেই, শ্রেণী-বৈষম্য নেই, বিভেদ ভেদাভেদ নেই। যদিও দু-একটা জায়গা আছে- যেগুলো চীনা দর্শন থেকে ভিন্ন, এবং যে কারণে সেসব জায়গায় নানা সংকট লেগেই আছে।
চীনে নারী-পুরুষে কোন ভেদাভেদ নেই। সবাই এক অধিকারে চলেন। হুট করে দেখে বোঝাও যায় না কে নারী আর কে পুরুষ। কোন ধর্ষণ, নির্যাতন, চুরি, ছিনতাই, খারাপ আইনশৃঙ্খলার অস্তিত্ব নেই। অতি দামি জিনিসও রাস্তায় ফেলে রাখলে কেউ নেবে না। বড় জোর পুলিশ সেগুলো হেফাজতে নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জিনিসের মালিককে খুঁজতে থাকবে।
আমাদের দেশে এখন প্রচন্ড গরম। চীনের অনেক অঞ্চলেও গরমকাল। কিন্তু বেইজিংয়ে প্রচন্ড শীত। এ শীত সহ্য করার মতো নয়। আমরা যখন বেইজিং ভ্রমণ করছিলাম (১৪-২২ অক্টোবর ২০২৫) তখন দিনে তাপমাত্রা ছিল সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দুপুরের পর থেকে এই তাপমাত্রা নামতে নামতে শূন্য ডিগ্রিতে পৌছাচ্ছিল। শহরের বাইরে আরও নীচে, অর্থাৎ মাইনাস ডিগ্রি ধরে তাপমাত্রা নামছিল। এমন তাপমাত্রা আমরা কখনও দেখিওনি, ভোগ করা তো দূরে থাক। এরকম অবস্থায় আমাদেরকে হোটেলে এসির ‘হট’ বাটন চেপে সময় কাটাতে হচ্ছিল। যদিও চীনা মানুষের এসব সওয়া। তারা কিন্তু এই ভয়ঙ্কর তাপমাত্রার মধ্যেও দিব্বি চলাফেরা বা সব ধরনের কাজকর্ম করছেন।
প্রিয় পাঠক- লেখা বড় হচ্ছে বলে আর বাড়াচ্ছি না। অনেক ঘটনা রয়েছে। পরবর্তী সংখ্যায় তা তুলে ধরার আশা রইলো।
লেখক : সম্পাদক-প্রকাশক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।




0 Comments: